বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

১৩ কার্তিক, ১৪৩৩◆১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
logo
সব বিভাগ

দৈনিক শিল্পবাংলা

আন্তর্জাতিক

সার্বিয়ায় ছাত্র-সমর্থিত জোটের ঐতিহাসিক জয়, পরাজয় স্বীকার ভুচিচের

দৈনিক শিল্পবাংলা
দৈনিক শিল্পবাংলা
২৮ অক্টোবর, ২০২৬ এ ২:০৭ PM
সার্বিয়ায় ছাত্র-সমর্থিত জোটের ঐতিহাসিক জয়, পরাজয় স্বীকার ভুচিচের

সার্বিয়ায় ছাত্র-সমর্থিত জোটের ঐতিহাসিক জয়, পরাজয় স্বীকার ভুচিচের

“

গত রোববার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত আগাম সংসদ নির্বাচনের পর সোমবার (২৬ অক্টোবর) সার্বিয়ার প্রজাতন্ত্র নির্বাচন কমিশন (RIK) প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করে। এতে দেখা যায়, ‘স্টুডেন্ট লিস্ট—স্টুডেন্টস আর উইনিং’ মোট ভোটের ৫২ দশমিক ৭১ শতাংশ পেয়ে ২৫০ আসনের জাতীয় সংসদে ১৪০টি আসন অর্জন করেছে।

Writing

সার্বিয়ায় ছাত্র-সমর্থিত জোটের ঐতিহাসিক জয়, পরাজয় স্বীকার ভুচিচের

দুই বছরের আন্দোলনের পর নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল স্টুডেন্ট লিস্ট; প্রাথমিক ফলে ১৪০ আসন

শিল্পবাংলা আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ২৮ অক্টোবর ২০২৬

প্রায় দুই বছর ধরে চলা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের পর সার্বিয়ার সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেছে ছাত্র-সমর্থিত রাজনৈতিক জোট ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’। দেশটির দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুচিচ নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেছেন। এর মধ্য দিয়ে বলকান অঞ্চলের দেশটির রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।

গত রোববার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত আগাম সংসদ নির্বাচনের পর সোমবার (২৬ অক্টোবর) সার্বিয়ার প্রজাতন্ত্র নির্বাচন কমিশন (RIK) প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করে। এতে দেখা যায়, ‘স্টুডেন্ট লিস্ট—স্টুডেন্টস আর উইনিং’ মোট ভোটের ৫২ দশমিক ৭১ শতাংশ পেয়ে ২৫০ আসনের জাতীয় সংসদে ১৪০টি আসন অর্জন করেছে।

অন্যদিকে ভুচিচের নেতৃত্বাধীন ‘আলেক্সান্দার ভুচিচ—ইউনাইটেড সার্বিয়া’ জোট ৩৯ দশমিক ১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ১০৪টি আসন পেয়েছে। নির্বাচনী কমিশনের প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ছাত্র-সমর্থিত তালিকাটি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

পরাজয় স্বীকার ভুচিচের

নির্বাচনের দিন রোববার রাতে টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে ভুচিচ স্বীকার করেন, তাঁর রাজনৈতিক জোট পরাজিত হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের সমর্থিত তালিকা বিজয়ী হয়েছে।

২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট হিসেবে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন ভুচিচ। তাঁর রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা সংকুচিত করার অভিযোগ তুলে আসছিলেন আন্দোলনকারীরা। তবে ভুচিচ ও তাঁর দল এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন।

নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসার পর রাজধানী বেলগ্রেডসহ সার্বিয়ার বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নেমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকেরা। জাতীয় পতাকা হাতে মিছিল, সংগীত ও আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে তাঁরা নির্বাচনী ফলাফল উদ্‌যাপন করেন।

যেভাবে শুরু হয়েছিল ছাত্র আন্দোলন

সার্বিয়ার এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূত্রপাত ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর। সেদিন দেশটির নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যু হয়।

এই দুর্ঘটনার পর অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কারকাজে দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির অভাবের অভিযোগ সামনে আসে। দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন।

ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন রাজধানী বেলগ্রেডসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকেরাও প্রতিবাদে অংশ নেন।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

প্রায় দুই বছরের ধারাবাহিক প্রতিবাদ, সমাবেশ ও নাগরিক সংগঠনের পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় আগাম সংসদ নির্বাচনে ছাত্র-সমর্থিত প্রার্থীদের তালিকা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

নেতৃত্বের নতুন ধরন

সার্বিয়ার ছাত্র আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল একক নেতার পরিবর্তে সম্মিলিত নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া।

নির্বাচনে বিজয়ী ছাত্র-সমর্থিত তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষক এবং বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

তবে আন্দোলনের সফল নির্বাচনী অভিযাত্রার পরও নতুন সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, মন্ত্রিসভায় কারা থাকবেন এবং আন্দোলনের দাবি কীভাবে রাষ্ট্রীয় নীতিতে বাস্তবায়িত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

ছাত্র-সমর্থিত পক্ষ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা খাতের উন্নয়ন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

বিজয়ের পর নতুন চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনী জয় সত্ত্বেও সার্বিয়ায় নতুন সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এখনো বাকি। চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ, সংসদ গঠন এবং নতুন মন্ত্রিসভা নির্ধারণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর সম্পন্ন হবে।

পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সার্বিয়ার বিদ্যমান সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও নতুন নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সার্বিয়ার এই নির্বাচন দেখিয়েছে, দীর্ঘদিনের নাগরিক আন্দোলন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে।

শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে শুরু হওয়া একটি আন্দোলন থেকে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের এই ঘটনা সার্বিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে। একই সঙ্গে তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং নাগরিক সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

তথ্যসূত্র: সার্বিয়ার প্রজাতন্ত্র নির্বাচন কমিশন, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।