ইসরায়েলের নির্বাচনে ঝুলন্ত ফল, সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দূরে নেতানিয়াহুর জোট
ভোটগণনায় এগিয়ে লিকুদ নেতৃত্বাধীন জোট, সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে আরব দলগুলো
শিল্পবাংলা আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ২৮ অক্টোবর ২০২৬
ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। বিরোধী জোটও প্রয়োজনীয় আসন থেকে পিছিয়ে থাকায় দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভোট গণনা বুধবারও অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলাফলে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট এগিয়ে থাকলেও কোনো পক্ষই সরকার গঠনের মতো অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বুধবার সকালের হালনাগাদ হিসাবে, ৪০ লাখের বেশি ভোট গণনার পর নেতানিয়াহুর জোট ৫৪টি এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৭টি আসন পেতে পারে। বাকি ১৯টি আসন আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর অনুকূলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
১২০ আসনের ইসরায়েলি সংসদ নেসেটে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে চলমান গণনার ভিত্তিতে কোনো জোটই এককভাবে সরকার গঠনের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না।
পরাজয় স্বীকার নয়, সরকার গঠনের দাবি নেতানিয়াহুর
নির্বাচনের পর জেরুজালেমে নিজের দল লিকুদের সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু একটি শক্তিশালী ডানপন্থী জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।
নির্বাচনে তাঁর দল লিকুদ সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার অবস্থানে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইরানের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট দাবি করেছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে দুই পক্ষের কেউই এখন পর্যন্ত সরকার গঠনের মতো নিশ্চিত সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেননি।
আরব দলগুলো হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি
এবারের নির্বাচনে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
প্রাথমিক ফল ও ভোট-পরবর্তী জরিপে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর উল্লেখযোগ্য আসন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনী হিসাব অনুযায়ী, এই দলগুলোর সমর্থন নতুন সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে নেতানিয়াহুর জোট আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে। অন্যদিকে আইজেনকটের বিরোধী জোটের মধ্যেও আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
ফলে নির্বাচনে তুলনামূলক বেশি আসন পাওয়ার পরও সরকার গঠন করতে পারবে কি না, তা নির্ভর করছে পরবর্তী রাজনৈতিক সমঝোতা ও জোট গঠনের ওপর।
গাজা যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ইস্যুর প্রভাব
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর দেশটিতে এটিই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
ওই হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, বিপুল প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের বিস্তার আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, যুদ্ধের কারণে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই বিপুল প্রাণহানি এবং মানবিক বিপর্যয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে বিরোধীরা ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা, সরকারের জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো সামনে এনেছে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলাও রাজনৈতিক বিতর্কের একটি বিষয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে আসছেন।
দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটার উপস্থিতি প্রায় সাত শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এই উচ্চ ভোটার উপস্থিতিকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রীয় নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইসরায়েলি সমাজে গভীর আগ্রহ ও মতভেদের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন সরকার গঠন কীভাবে হবে?
ভোটগণনা সম্পন্ন হওয়ার পর নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। বর্তমান সূচি অনুযায়ী, ৪ নভেম্বর চূড়ান্ত ফল প্রকাশের কথা রয়েছে।
এরপর ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ সংসদে নির্বাচিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের জন্য একজন নেতাকে দায়িত্ব দেবেন।
নির্ধারিত প্রার্থী সরকার গঠনে সর্বোচ্চ ৪২ দিন সময় পেতে পারেন। প্রথম প্রার্থী ব্যর্থ হলে অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়া হতে পারে। কোনো পক্ষ সরকার গঠন করতে না পারলে নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
এদিকে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
ফলে চলমান নির্বাচনের ফলাফল শুধু নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই নয়, গাজা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরায়েলের নীতি, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, দ্য জেরুজালেম পোস্ট এবং ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য।
প্রতিবেদনটি ২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে চলমান ভোটগণনা ও প্রাথমিক আসন প্রক্ষেপণের ভিত্তিতে প্রস্তুত। চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর সংখ্যাগুলো পরিবর্তিত হতে পারে।




