দৈনিক শিল্পবাংলা লোগো
সব বিভাগ

দৈনিক শিল্পবাংলা

বিনোদন

জাবিতে জারি ও লোকজ সংস্কৃতির মঞ্চায়ন: শিল্প-সংস্কৃতি যখন অপসাংবাদিকতা ও সস্তা ট্রোলের বিপরীতেও উজ্জ্বল

দৈনিক শিল্পবাংলা
দৈনিক শিল্পবাংলা
১৬ এপ্রিল, ২০২৬ এ ৪:৪১ PM
জাবিতে জারি ও লোকজ সংস্কৃতির মঞ্চায়ন: শিল্প-সংস্কৃতি যখন অপসাংবাদিকতা ও সস্তা ট্রোলের বিপরীতেও উজ্জ্বল

জাবিতে জারি ও লোকজ সংস্কৃতির মঞ্চায়ন: শিল্প-সংস্কৃতি যখন অপসাংবাদিকতা ও সস্তা ট্রোলের বিপরীতেও উজ্জ্বল

জাবিতে বৈশাখী আয়োজনে জারি, যাত্রা ও পদাবলীর মঞ্চায়ন ঘিরে অপপ্রচার ছড়ালেও সত্য ও শিল্পের শক্তিতে শিক্ষার্থীদের শেকড়ভিত্তিক সংস্কৃতি জয়ী হয়েছে।

জাবিতে জারি ও লোকজ সংস্কৃতির মঞ্চায়ন: শিল্প-সংস্কৃতি যখন অপসাংবাদিকতা ও সস্তা ট্রোলের বিপরীতেও উজ্জ্বল

​নিজস্ব প্রতিবেদক দৈনিক শিল্পবাংলা , জাবি:

বাঙালির হাজার বছরের ধ্রুপদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শেকড় উন্মোচনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছিল জারিগান, যাত্রাপালা এবং পদাবলীর মতো অনন্য ও ঐতিহ্যবাহী সব পরিবেশনা। তবে শিক্ষার্থীদের এই নিষ্ঠা ও সৃজনশীল প্রয়াসকে ব্যাহত করতে সচেষ্ট ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার এবং কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টালের দায়িত্বজ্ঞানহীন হলুদ সাংবাদিকতা। কিন্তু দিনশেষে সব বাধা ও সস্তা ট্রোলিং উপেক্ষা করে জাবির শিক্ষার্থীদের এই শেকড়সন্ধানী শিল্পভাবনা সত্যের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

​বিভ্রান্তির জাল ও ‘হলুদ সাংবাদিকতার’ ব্যর্থতা:

​ঘটনার সূত্রপাত হয় জারিগানের মহড়াকালীন একটি খণ্ডচিত্রকে কেন্দ্র করে। প্রকৃত প্রেক্ষাপট যাচাই না করেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি বিভ্রান্তিকর শিরোনামে 'বৈশাখের অদ্ভুত নাচ' হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মূলত সস্তা ভিউ আর রিচ বাড়ানোর নেশায় লিপ্ত কিছু প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইনভিত্তিক কিছু ব্যাক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো প্রকৃত ইতিহাস না জেনেই বিদ্রূপাত্মক প্রচারণা শুরু করে। এতে সাধারণ নেটিজেনদের একটি অংশ বিভ্রান্ত হয়ে সুস্থ সংস্কৃতির ওপর সামাজিক ট্রোলিং শুরু করে। অথচ এর নেপথ্যে যে গভীর শোক ও ঐতিহ্যের গল্প লুকিয়ে ছিল, তা আড়ালেই থেকে গেছে ভার্চুয়াল দুনিয়ার অপরিণত দর্শকদের কাছে।

​জারিগানের মূল সুর'আহাজারি' থেকে দ্রোহ:

​জারি গানের 'জারি' শব্দটি ফারসি শব্দ 'আহাজারি' থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ বিলাপ বা শোক প্রকাশ। ১৬শ শতাব্দীতে কারবালার বিয়োগান্তক কাহিনীকে কেন্দ্র করে এই গানের উৎপত্তি। জারিগানে একজন প্রধান বয়াতি থাকেন এবং তাকে ঘিরে থাকেন একদল 'দোহার' বা জুরি। গানের মুদ্রায় পায়ে নূপুর বেঁধে গোল হয়ে যে ছন্দোময় চলন ও উচ্চকিত শারীরিক ভাষা দেখা যায়, তা মূলত কারবালার যুদ্ধের শোক এবং এক ধরনের আত্মিক দ্রোহের প্রতীক।এই উপাদানগুলোর সম্মিলিত ও যথাযথ ব্যবহারের মধ্য দিয়েই জারি গানের নান্দনিকতা ও অনন্যতা ফুটে উঠে।মঞ্চের পারফরমার বা শিল্পীরা বিভিন্ন ধাপ ও প্রক্রিয়ায় এই জটিল বিষয়গুলো আত্মস্থ ও সমন্বয় ঘটিয়ে থাকেন। ফলে যারা শুধু ফেসবুকের রসালো রিলস দেখে কিংবা বিভ্রান্তিকর শিরোনামে ছড়িয়ে পড়া সেই সংবাদকে সত্য ভেবে রিহার্সালের ঐ বিচ্ছিন্ন মুহূর্তটিকে সাধারণ নৃত্যের সাথে তুলনা করে একে 'হাস্যকর নাচ' বলছেন, তারা মূলত বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই ধ্রুপদী শৈল্পিক ভাষা ও ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

পদাবলী, যাত্রা,জারি,বাঙালির তিন সাংস্কৃতিক স্তম্ভেরঐতিহ্য ও গুরুত্ব:

​জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আয়োজনে যে তিনটি ধারাকে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা বাঙালির জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ-

​জারিগান: এটি মুসলিম ঐতিহ্যের সাথে লোকজ সুরের এক চমৎকার মেলবন্ধন, যা মানুষের ত্যাগের মহিমা ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা দেয়।

​যাত্রাপালা: বাংলার আদি থিয়েটার। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সামাজিক সংস্কারে যাত্রাপালা বরাবরই প্রতিবাদের প্রধান গণমাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।

​পদাবলী: প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে মানুষের সাথে ঈশ্বরের সম্পর্কের দার্শনিক রূপ। চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির হাত ধরে এটি বাঙালির হৃদয়ের কোমলতা এবং উচ্চতর চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়েছে।

​মঞ্চের সামনে আবেগের প্লাবন, শিল্প ও সত্যের জয়:

বিভ্রান্তি ও অঙ্গতার দরূণ ​ভার্চুয়াল মাধ্যমে সমালোচনা হলেও, যারা সম্পূর্ণ মঞ্চায়ন স্ক্রিনের ওপারে থেকে বা সশরীরে মঞ্চের সামনে উপস্থিত থেকে দেখেছেন , তাদের অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত ছন্দে কণ্ঠে ও শরীরী ভাষায় ফুটে ওঠা করুণ সুর আর ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে উপস্থিত দর্শকরা মুহূর্তেই স্তব্ধ ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অনেকেই অশ্রুসিক্ত নয়নে শিক্ষার্থীদের এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। দর্শকদের মতে, রিলস কালচারের এই যুগে বর্তমান প্রজন্মের এমন গভীর জীবনবোধ এবং শেকড়ের টান প্রমাণ করে যে, প্রকৃত শিল্পকে ট্রোল করে দমানো যায় না।

​সাংস্কৃতিক জাগরণের বার্তা:

​সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, কোনো খণ্ডিত ভিডিও দিয়ে একটি সুগভীর শিল্পকে বিচার করা কেবল মূর্খতাই নয়, বরং নিজের পরিচয়কে হেয় করার শামিল। অপসংস্কৃতি আর ভুল প্রচারণার ভিড়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জারি, যাত্রা আর পদাবলীর মতো শেকড়মুখী শিল্পের চর্চা এখন সময়ের দাবি। সমালোচনার ঝড় উপেক্ষা করে দিনশেষে জাবির শিক্ষার্থীদের এই প্রয়াস জয়ী হয়েছে এবং প্রমাণ করেছে যে— শিল্প যখন সত্য হয়, তখন তা সব অপপ্রচারের বিপরীতেও উজ্জ্বল ও অমলিন হয়ে থাকে।

সর্বশেষ খবর

আরও দেখুন
কবির হোসেন প্রান্তিক কৃষক, কার্ড পাওয়ার 'যোগ্য': তদন্ত প্রতিবেদন
1

কবির হোসেন প্রান্তিক কৃষক, কার্ড পাওয়ার 'যোগ্য': তদন্ত প্রতিবেদন

টাঙ্গাইলে কৃষক কার্ড পাওয়া কবির হোসেনকে নিয়ে বিতর্কের পর তদন্তে তাকে প্রকৃত প্রান্তিক কৃষক হিসেবে নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন; ভাইরাল ছবিগুলো এআই তৈরি বলে দাবি উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে দাদির স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করলেন জাইমা রহমান
2

প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে দাদির স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করলেন জাইমা রহমান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৬ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করেন; ১৫ ব্যক্তি ও ৫ প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা, খালেদা জিয়াকে মরণোত্তর পুরস্কার প্রদান করা হয়।

সাভার বিরুলিয়ায় শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে, মামলার পলাতক আসামি গ্রেফতার
3

সাভার বিরুলিয়ায় শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে, মামলার পলাতক আসামি গ্রেফতার

সাভারের বিরুলিয়ায় শিশুধর্ষণ মামলার পলাতক আসামি আব্দুল বারেক গ্রেফতার। ৯ দিন পর পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ে আদালতে প্রেরণ। ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ।