আশি ও নব্বইয়ের দশকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে কিংবদন্তি শেফালী ঘোষ ও কল্যাণী ঘোষের সঙ্গে উচ্চারিত হতো কক্সবাজারের শিল্পী বুলবুল আকতারের নাম। তিনি যেখানে গান করতে যেতেন, সেখানে মানুষের ঢল নামত। তার কণ্ঠে ‘ও কালা ভ্রমরা আঁই আইজো ফুলর করা’, ‘প্রেমর বাতাস লাগিল যার গায়’, ‘বাঁকখালীর মাঝি ও ভাই সোনাদিয়া বাসা’ কিংবা ‘নাজিরহাটের মাইজভান্ডারে মেলা বইসাছে’ গানগুলো শুনে মানুষ উন্মাতাল হতেন। গত দুই-তিন যুগে সারাদেশে তুমুল জনপ্রিয় একটি গান ‘অ কালা চাঁন গলার মালা পেট পুরেদ্দে তোঁয়াল্লাই’– যে গানের শিল্পী বুলবুল আকতার। এই কিংবদন্তি শিল্পী বর্তমানে আর্থিক দুর্দশায় আছেন। রোগেশোকে কাতর। চিকিৎসার সম্বল নেই। মেয়ের করে দেওয়া একটি কুঁড়েঘরে থাকেন। সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান তার খবর নেয় না। শিল্পীর দুরবস্থা নিয়ে গত বছরের ৫ অক্টোবর সমকালে ছাপা হয়েছিল একটি প্রতিবেদন, শিরোনাম– ‘অনারাত্তুন আঁর লাই বলি কি পেট ন পুরে নে?’
অবশেষে রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে স্বীকৃতি ও পুরস্কার পেলেন শিল্পী বুলবুল আকতার। এবার চসিকের স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা পেয়েছেন শিল্পী বুলবুল আকতার। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অবদানের জন্য শিল্পী বুলবুল আকতার এই সম্মাননা পেলেন তিনি। এবার স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদানের জন্য সাবেকমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান (মরণোত্তর), শিক্ষায় চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নূর আহমদ চেয়ারম্যান (মরণোত্তর), চিকিৎসায় এমএ ফয়েজ, সাংবাদিকতায় দৈনিক পূর্বকোণের সম্পাদক ডা. ম. রমিজ উদ্দিন চৌধুরী, ক্রীড়ায় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান চসিকের সম্মাননা পেয়েছেন। এত গুণীজনের সঙ্গে চসিক সম্মাননা পাওয়ায় দারুণ খুশি শিল্পী বুলবুল আকতার।
গতকাল অনুভূতি জানার জন্য ফোন করেছিলাম শিল্পী বুলবুল আকতারকে। তিনি শুধু এটুকুই বললেন, ‘চট্টগ্রামের মেয়র আমার কথা মনে রেখেছেন, সে জন্য আমি খুশি। অতীতে সুফি মিজান ফাউন্ডেশন আমাকে বারবার আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। আর কেউ আমার খবর নেয়নি। আমার জন্য যাদের পেট পুড়ে তাদের সালাম। কিছু পাই বা না পাই, সারাজীবন গান গাইব।’
মাত্র সাত বছর বয়সে সুরের খেয়ায় ভেসেছিলেন। এখন তার বয়স ৬৩, মাঝখানে টানা ৫৬ বছর ধরে সুরে সুরে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন তিনি। গান গেয়েছেন চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের পথে-প্রান্তরে। ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে তার প্রায় ৯৮টি অডিও ক্যাসেট বেরিয়েছে। তার অসংখ্য গান মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এই শিল্পীর গান গেয়ে এখনও দেশজোড়া জনপ্রিয়তা পান নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা। চাটগাঁইয়া গানের জীবন্ত এই কিংবদন্তির নাম বুলবুল আকতার। কক্সবাজারের শিল্পী বুলবুলি।মহেশখালীর মাইজভান্ডারি সাধক আলম ফকিরের কন্যা বুলবুলির গানের হাতেখড়ি তার বাবার কাছে।
বুলবুল আকতার চাটগাঁইয়া গানের ক্লাসিক যুগের শেষ প্রতিনিধিদের একজন। শেফালী ঘোষ চলে গিয়েছেন, চাটগাঁইয়া গানের উজ্জ্বল আলোক শিখা হিসাবে এখনও আছেন কল্যাণী ঘোষ ও বুলবুল আকতার। তাদের মানের শিল্পী আগামী ১০০ বছরে আর আসবে কিনা সন্দেহ। চাটগাঁইয়া গানে এই গুণী শিল্পীদের এখনও অনেক কিছু দেওয়ার আছে। সে জন্য প্রয়োজন এই শিল্পীদের কদর বোঝা, তাদের পরিচর্যা করা, ভালোবাসা নিয়ে শিল্পীর পাশে দাঁড়ানো




